বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লকের জন্য আগামীকাল রবিবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ নভেম্বর।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শনিবার রাত ১২টার পর দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি পেট্রোবাংলার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি দেশের আটটি জাতীয় দৈনিকেও এটি প্রকাশিত হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশে ও বিদেশে প্রচার কার্যক্রম, সংবাদ সম্মেলন, রোড শো এবং বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগ্রহী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সমুদ্র জরিপ ও কারিগরি তথ্য সংগ্রহ করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রবিবার দুপুর আড়াইটায় সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি ও দরপত্র কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আহ্বান করা দরপত্রে সাতটি বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রস্তাব জমা দেয়নি।
তবে এবার সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। নতুন ব্যবস্থায় অনুসন্ধান পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের মতো ৫০ শতাংশ এলাকা ত্যাগ করতে হবে না; পরিবর্তে ২০ শতাংশ এলাকা ছাড়লেই হবে। পাশাপাশি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে উচ্চ সালফারযুক্ত জ্বালানি তেলের মূল্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হলেও এখন তা ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম নির্ধারিত হবে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির চাপ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অংশে গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক রয়েছে। অতীতে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এ খাতে কাজ শুরু করলেও নানা কারণে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২০১০ সালে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকে অনুসন্ধান শুরু করলেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবি পূরণ না হওয়ায় সরে দাঁড়ায়। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানও চুক্তি বাতিল করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
পরে ২০১৯ সালে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে একটি কূপ খনন করলেও গ্যাসের সন্ধান পায়নি। দ্বিতীয় কূপ খননের আগেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।
সরকার আশা করছে, সংশোধিত শর্তাবলীর কারণে এবার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র খুঁজছে, ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি খাত তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মন্তব্য করুন