বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর একটি হলো বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্ব। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় ‘মানবসম্পদ রফতানি’ বা বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে কেবল রেমিট্যান্স আয়ের উৎস হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সাধারণ ধারার বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী, পাশাপাশি কওমি মাদরাসার অসংখ্য শিক্ষার্থী বেকারত্বের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। পরিবার ও রাষ্ট্র বছরের পর বছর তাদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এই মানবসম্পদকে দক্ষতা, যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করার কার্যকর কোনো জাতীয় পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বেকার জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা কিংবা কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের কোনো নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ শুমারি বা ডাটাবেইসও গড়ে ওঠেনি। ফলে দেশে ও বিদেশে চাহিদাভিত্তিক চাকরির বাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা পরিকল্পিত মানবসম্পদ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কার্যকর রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
গত দেড় দশকে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর আকর্ষণীয় স্লোগান ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে অপরিকল্পিত শিক্ষা সম্প্রসারণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীতির কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি। বরং জাতির এই মূল্যবান শক্তির বড় অংশকে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও নির্ভরশীলতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাই বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি প্রশ্ন হলো—কীভাবে এই ভয়াবহ বেকারত্ব সমস্যার কার্যকর ও টেকসই সমাধান করা যায়।
এ নিবন্ধের প্রস্তাব হলো—সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে কর্মসংস্থান পরিচালনা, দূতাবাসকে সক্রিয় শ্রমবাজার অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর, এবং দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা—বাস্তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী ধারণা। তবে এটি সফল করতে হলে অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষ বিদেশে যেতে চায়, এবং এজন্য নিজের অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় তারা প্রায়ই দালালচক্র, জালিয়াতি, ভুয়া ভিসা, অতিরিক্ত খরচ, প্রতারণা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় একটি সরকার-নিয়ন্ত্রিত নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে প্রস্তাব করা হচ্ছে—
* বিদেশে যেতে আগ্রহীরা নির্ধারিত ফি ও প্রয়োজনীয় খরচ সরাসরি সরকারি তহবিল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জমা দেবে।
* এরপর সরকার বা সরকার অনুমোদিত অংশীদার প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া—চাকরি যাচাই, প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, ভিসা, টিকিট, চুক্তি ও বিদেশে গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়—নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করবে।
* এতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে, খরচ কমবে, এবং নাগরিকরা নিরাপদ ও বৈধভাবে বিদেশে যেতে পারবে।
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি: কেন ‘মানবসম্পদ রফতানি’ গুরুত্বপূর্ণ?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে “Labour Export Model” বা শ্রমশক্তি রফতানি এমন একটি নীতি, যেখানে জনবহুল উন্নয়নশীল দেশগুলো অতিরিক্ত শ্রমশক্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠিয়ে—
* বেকারত্ব কমায়
* বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে
* সামাজিক চাপ হ্রাস করে
* মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে
* আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগ শক্তিশালী করে
এটি মূলত তিনটি তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত:
ক) Comparative Advantage Theory
বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো বিপুল তরুণ জনসংখ্যা। কম খরচে দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমশক্তি সরবরাহে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে পারে।
খ) রেমিটেন্স-চালিত উন্নয়ন
বিদেশফেরত আয় (রেমিট্যান্স) দেশের ভোগ, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে।
গ) জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ
যুবসমাজকে কর্মহীন রেখে দিলে তা সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে; কিন্তু দক্ষ কর্মশক্তি হিসেবে বিদেশে পাঠাতে পারলে তা অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
২. অর্থনৈতিক সুবিধা
ক) বেকারত্ব কমবে
বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ তরুণ চাকরির বাজারে আসে। দেশীয় শিল্প একা এত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। বিদেশি শ্রমবাজার এই চাপ কমাতে পারে।
খ) রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
বর্তমানে প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে দক্ষ শ্রম রফতানি করা যায়, তাহলে রেমিট্যান্স কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
গ) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে
রফতানি ও রেমিট্যান্স মিলে ডলার সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
ঘ) গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকবে
বিদেশফেরত আয়ে:
* বাড়ি নির্মাণ
* কৃষি বিনিয়োগ
* ক্ষুদ্র ব্যবসা
* শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
৩. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা
ক) দূতাবাসের ভূমিকা বদলাবে
বর্তমানে অনেক দূতাবাস মূলত কনস্যুলার কাজেই সীমাবদ্ধ। এগুলোকে “Economic & Labour Mission”-এ রূপান্তর করা যায়।
প্রতিটি দূতাবাসের Key Performance Indicator (KPI) হতে পারে:
* কতজন কর্মী পাঠানো হলো
* কতটি নতুন শ্রমবাজার খোলা হলো
* কতটি দক্ষতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো
খ) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হবে
শ্রমশক্তি রফতানি অনেক সময় কূটনৈতিক সম্পর্ককে গভীর করে।
গ) সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়বে
বেকার তরুণদের হতাশা কমলে অপরাধ, মাদক ও রাজনৈতিক সহিংসতাও কমতে পারে।
৪. ব্যবসায়িক সুবিধা
ক) নতুন শিল্প তৈরি হবে
* প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান
* ভাষা শিক্ষা
* আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন
* মেডিকেল টেস্টিং
* স্কিল টেকনোলজি
খ) দক্ষতা রফতানি
বাংলাদেশ কেবল নির্মাণ শ্রমিক নয়—
* নার্স
* কেয়ারগিভার
* ওয়েল্ডার
* আইটি কর্মী
* জাহাজ নির্মাণ কর্মী
* কৃষি প্রযুক্তিবিদ
* ড্রাইভার
* হোটেল স্টাফ রফতানি করতে পারে।
৫. সামাজিক সুবিধা
ক) দারিদ্র্য কমবে
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বহু পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে তুলেছে।
খ) নারী ক্ষমতায়ন
নারী কর্মীদের নিরাপদ ও দক্ষ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়বে।
গ) দক্ষতা স্থানান্তর
বিদেশফেরত কর্মীরা দেশে নতুন প্রযুক্তি ও কাজের সংস্কৃতি নিয়ে আসে।
৬. সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অসুবিধা
ক) Brain Drain
অতিরিক্ত দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে গেলে দেশে দক্ষতার ঘাটতি হতে পারে।
খ) মানবাধিকার লঙ্ঘন
মধ্যপ্রাচ্যসহ কিছু দেশে:
* পাসপোর্ট জব্দ
* কম মজুরি
* নির্যাতন
* শ্রম অধিকারহীনতা গুরুতর সমস্যা।
গ) রেমিট্যান্স নির্ভরতা
অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ঘ) দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট
বর্তমানে:
* দালাল
* অতিরিক্ত ভিসা খরচ
* প্রতারণা সবচেয়ে বড় সমস্যা।
ঙ) সামাজিক সমস্যা
দীর্ঘদিন পরিবার বিচ্ছিন্নতা:
* বিবাহ ভাঙন
* সন্তানদের মানসিক সমস্যা
* সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে।
৭. বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা
ফিলিপাইন সবচেয়ে সফল মডেলগুলোর একটি
ফিলিপাইন সরকার Overseas Employment Administration গঠন করে। তাদের বৈশিষ্ট্য:
* রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
* বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
* ভাষা শিক্ষা
* শ্রমিক সুরক্ষা
* দূতাবাসে শ্রম উইং
* নারী কর্মীদের বিশেষ সুরক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার EPS মডেল
Employment Permit System (EPS):
* সরকার-টু-সরকার নিয়োগ
* কম খরচ
* দালালমুক্ত ব্যবস্থা
বাংলাদেশের জন্য বড় উদাহরণ।
৮. বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা
প্রথম ধাপ: জাতীয় শ্রম রফতানি নীতি
রাষ্ট্রীয়ভাবে “National Human Resource Export Strategy” তৈরি করতে হবে।
লক্ষ্য:
* দক্ষ শ্রমিক বৃদ্ধি
* অভিবাসন খরচ কমানো
* নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা
দ্বিতীয় ধাপ: ‘একক সরকারি অভিবাসন ব্যবস্থা’
বিদেশে যেতে আগ্রহীরা:
* অনলাইনে নিবন্ধন করবে
* নির্ধারিত ফি সরকারি অ্যাকাউন্টে জমা দেবে
* ডিজিটাল ট্র্যাকিং নম্বর পাবে
এরপর সরকার:
* চাকরি যাচাই
* নিয়োগপত্র যাচাই
* প্রশিক্ষণ
* ভাষা শিক্ষা
* মেডিকেল
* ভিসা
* বিমান টিকিট
* বিদেশে রিসিভ ব্যবস্থা
সম্পন্ন করবে।
এতে:
* দালাল কমবে
* খরচ কমবে
* প্রতারণা কমবে
* রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়বে
তৃতীয় ধাপ: দূতাবাস পুনর্গঠন
প্রতিটি দূতাবাসে:
* Labour Market Intelligence Cell
* Legal Support Unit
* Worker Protection Desk গঠন করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তি
বিশেষ গুরুত্ব:
* জাপান
* দক্ষিণ কোরিয়া
* জার্মানি
* সৌদি আরব
* সংযুক্ত আরব আমিরাত
শেষ কথা
বিদেশে কর্মসংস্থানকে যদি কেবল ‘মানুষ পাঠানো’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা দালালনির্ভর শোষণমূলক ব্যবস্থায় পরিণত হবে। কিন্তু এটিকে যদি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশল হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও কূটনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
মানুষ বিদেশে যেতে চায়; তারা টাকা খরচ করতেও রাজি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—সেই আকাঙ্ক্ষাকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ পথে পরিচালিত করা। সরকার যদি নাগরিকের কাছ থেকে স্বচ্ছভাবে অর্থ গ্রহণ করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নেয়, তাহলে প্রতারণা, জালিয়াতি ও হয়রানির বড় অংশ বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশকে ‘দালালনির্ভর শ্রম রফতানিকারক দেশ’ থেকে ‘রাষ্ট্র-পরিচালিত দক্ষ মানবসম্পদ রফতানিকারক রাষ্ট্রে’ রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন