
বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস ও কেন্দ্রভাড়ার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে। বক্তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনার দায় গ্রাহকদের বহন করা উচিত নয়; বরং অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে কীভাবে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
গতকাল বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে এই গণশুনানির আয়োজন করা হয়। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের উচ্চ মূল্য ও ভর্তুকি কমানোর কারণ দেখিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বেশি।
তবে বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, সরকার যদি ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১২ টাকা ৫৫ পয়সায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ দাম বাড়তে পারে প্রায় ৭৮ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাব্য ব্যয়ের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্রভাড়া বা সক্ষমতা চার্জ পরিশোধে।
কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৬১ শতাংশ এবং আমদানি করা বিদ্যুতের কেন্দ্রগুলো ৭৭ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রভাড়া, জ্বালানি ব্যয় ও সিস্টেম লসের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের কাঁধেই চাপানো হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে ১৩ টাকা ৯ পয়সা হতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় উৎপাদন খরচ ছিল ১১ টাকা ৪ পয়সা। পরের অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ১০ টাকা ৯৬ পয়সা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার বেড়ে ১১ টাকা ৮৩ পয়সা ধরা হয়েছে।
গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থিক ঘাটতির পুরোটা নয়, কেবল একটি অংশ সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সরকারকে এখনো বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, অদক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও কেন্দ্রভাড়ার দায় কোনোভাবেই সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো উচিত নয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে তারা প্রস্তুত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও দেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে কোনো অর্থনীতিবিদের মতামত নেওয়া হয়নি।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে পোশাক খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়বে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় শিল্প খাতকে নতুন সংকটে ফেলবে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী ডিন অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যে ভর্তুকি দেয়, সেই অর্থও শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছ থেকেই আসে। তাই কেবল সরকারের আর্থিক নিরাপত্তা নয়, সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন জনগণের স্বার্থের বদলে কেবল বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে জনগণের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
গণশুনানিতে বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও স্বীকার করেন যে অতিরিক্ত কেন্দ্রভাড়া, অদক্ষ উৎপাদন ব্যয় ও সিস্টেম লসের দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো উচিত নয়।
তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পকারখানাগুলোকে আলাদা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হতো না। এতে গ্যাসের অপচয়ও কমানো সম্ভব হতো এবং জাতীয় গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও সাশ্রয়ী হতো।
মন্তব্য করুন