দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি ভিটামিন এ ঘাটতি পূরণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হাম, রাতকানা ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা প্রতিরোধে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ ভিটামিন এ ক্যাপসুল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৭১ হাজারের বেশি শিশু। এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৫১২ জন।
এ পরিস্থিতিতে সরকার প্রায় ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল সংগ্রহ করবে। শনিবার অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে ২ লাখ আইইউ ও ১ লাখ আইইউ মাত্রার ভিটামিন এ ক্যাপসুল সংগ্রহ করা হবে, যাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে মজুত থাকা ভিটামিন এ ক্যাপসুল হাম আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। ইউনিসেফ আগামী ১০ জুনের মধ্যে নতুন চালান সরবরাহ করবে। দেশে আসবে প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ উচ্চমাত্রার এবং ৪০ লাখ নিম্নমাত্রার ভিটামিন এ ক্যাপসুল। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন ক্যাম্পেইনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনের পর স্বাস্থ্যখাতের কর্মসূচি বন্ধ থাকায় নতুন করে ভিটামিন এ ক্যাপসুল কেনা হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ মাসে আগের মজুত থেকে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়।
বাংলাদেশে শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। পরে এটি জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন হিসেবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে বছরে দুইবার পরিচালিত এ কর্মসূচিতে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃমিনাশক ওষুধও বিতরণ করা হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় বহু শিশু প্রয়োজনীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যার প্রভাব এখন হামের সংক্রমণে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, ভিটামিন এ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শুধু রাতকানা প্রতিরোধই করে না, শরীরের শ্বাসনালী ও অন্ত্রের সুরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী রাখে। ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
ডা. সঞ্জয় কুমার দে আরও বলেন, হামের সঙ্গে ভিটামিন এ-এর ঘাটতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হাম হলে শরীরের বিদ্যমান ভিটামিন এ দ্রুত কমে যায়। আগে থেকেই ঘাটতি থাকলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির মতো জটিলতা বাড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু ও সংক্রমণকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৩ শিশুর মৃত্যু হলেও বিষয়টিকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে দেখা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি হামের পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা বাড়ানো, হাসপাতালের বেড বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং প্রতিটি মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর পৃথক মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং কেন মৃত্যু হচ্ছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে হামকে মহামারি ঘোষণা করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া সহজ হবে বলেও মত দেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু টিকাদান নয়, সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
তিনি প্রস্তাব দেন, কমিউনিটি পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের জন্য উন্নত অক্সিজেন সেবা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো জরুরি।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আগামী এক মাস টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে শহরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ টিকাদল গঠন করে রাতেও টিকা কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ঈদ উপলক্ষে মানুষের চলাচল বাড়লে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকবে।
একই সঙ্গে তিনি ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের দ্রুত ভিটামিন এ সরবরাহ করা গেলে হামের জটিলতা ও মৃত্যুহার অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন