Rasel Sheikh
২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ওষুধের আসল–নকল চেনা দায়

ওষুধের দাম বাড়ার চাপ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। তার ওপর নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভেজাল ও নকল ওষুধের বিস্তার। বাজারে এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে আসল ওষুধ আর নকলের পার্থক্য খালি চোখে বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ। এতে রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।

কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ভেজাল ও নকলের উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে চিকিৎসকদের একটি অংশ এসব ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করাই বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তেমনই একটি ওষুধ হলো অ্যালবুমিন ইনজেকশন। বড় ধরনের অস্ত্রোপচার কিংবা গুরুতর আঘাতের পর রোগীর রক্তে প্লাজমার পরিমাণ বাড়াতে এ ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের অভিযোগ, বাজারে এখন নকল অ্যালবুমিন ইনজেকশনে সয়লাব। বছরখানেক আগে সিলেটে অ্যালবুমিন প্রয়োগের পর এক রোগীর মৃত্যু এবং ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে রোগীর শরীরে জটিলতা দেখা দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে সেগুলো নকল বলে নিশ্চিত হন চিকিৎসকেরা।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, নকল অ্যালবুমিন ইনজেকশন দেখতে এতটাই আসলের মতো যে সাধারণভাবে আলাদা করা যায় না।

গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র

বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকায় বিক্রি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় ১০ শতাংশই নকল, ভেজাল অথবা নিম্নমানের। ঢাকার বাইরে এই হার আরও বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করে জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি ও জার্মানির এবাহার্ড কার্ল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক।

গবেষণার প্রথম ধাপে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিকের তিন ধরনের ওষুধের ১৮৯টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো হলো—ইসোমিপ্রাজল, সেফিক্সিম ও অ্যামোক্সিসিলিন-ক্লাভুলানিক অ্যাসিড। পরীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার নমুনার প্রায় ১০ শতাংশ নকল, ভেজাল বা নিম্নমানের।

দ্বিতীয় ধাপে ঢাকার বাইরের জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ—২০ শতাংশ। গবেষকেরা জানান, কোনো কোনো নকল ওষুধে উপাদান হিসেবে আটা, ময়দা এমনকি সুজিও পাওয়া গেছে।

আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই

নকল ও ভেজাল ওষুধ ঠেকাতে ২০২৩ সালে ওষুধ ও কসমেটিক আইন পাস করে সরকার। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইন পাসের পর এখন পর্যন্ত এই আইনে কাউকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়ার নজির নেই।

ভোক্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও নজরদারির অভাবেই নকল ওষুধের ব্যবসা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের মার্চে ঢাকা ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে আটা, ময়দা ও সুজি দিয়ে নকল অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় প্রায় পাঁচ লাখ নকল ওষুধ। পুলিশ জানায়, এই চক্রটি প্রায় এক দশক ধরে নকল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি করে আসছিল।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর আশঙ্কা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল ও নকল ওষুধ জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এসব ওষুধে তাৎক্ষণিকভাবে রোগ না সারার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শরীরে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে নকল ওষুধ মৃত্যুর কারণও হয়ে উঠছে।

গত বছর ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের পর অন্তত তিনটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যবহৃত হ্যালোথেন ভেজাল ছিল। এরপর সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে এই ওষুধের ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

নজরদারির ঘাটতি

ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার একাধিক ওষুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ওষুধ প্রশাসনের তৎপরতা কমে গেছে। এই সুযোগে নকল ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ আবার বেড়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, আগে নকল ওষুধ সরাসরি বাজারে দেওয়া হলেও এখন অনলাইন ও কুরিয়ারের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ও ভেজাল ওষুধ শুধু রোগীকে প্রতারিতই করছে না, বরং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত মান পরীক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই।

আরএস

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ওসমান হাদির সাংস্কৃতিক লড়াই পরিপূর্ণ করতে চাই : আখতার হোসেন

তারেক রহমান আসছেন মানেই গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন : মির্জা আব্বাস

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের

সংসদ নির্বাচনের তফসিল আংশিক সংশোধন করল ইসি

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র : গভর্নর

হাদির মরদেহ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা

স্যার ফজলে হাসান আবেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ওসমান হাদির জানাজায় অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল

দক্ষিণ সুদানে শহীদ ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছেছে

সম্মান দিলে ইউক্রেনের পর আর কোনো যুদ্ধ করবে না রাশিয়া

১০

হাদির জানাজা পড়াবেন বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক

১১

কুড়িগ্রামে কনকনে ঠান্ডায় বিপর্যস্ত জনজীবন

১২

ফেরেশতা পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন সাহাবি মুয়াবিয়ার জানাজায়

১৩

ময়মনসিংহে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৭

১৪

সন্ত্রাস-সহিংসতার আহ্বানবাণীযুক্ত পোস্টের অভিযোগ দিতে হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমেইলের আহ্বান

১৫

সৌদি আরবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সংখ্যা বেড়ে ৫০০

১৬

সিরিয়ার ওপর সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় স্বাগত জানিয়েছে দামেস্ক

১৭

আজ সিলেট ও রংপুরে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট

১৮

ওষুধের আসল–নকল চেনা দায়

১৯

নির্বাচন অনিশ্চিত করার ষড়যন্ত্র এই হামলা: মির্জা ফখরুল

২০