দেশে বিদ্যুতের দাম আবারও বড় আকারে বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন ঘোষণায় গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন চার্জও প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুন মাস থেকেই নতুন দর কার্যকর হবে এবং জুলাই মাসে গ্রাহকদের বর্ধিত বিল পরিশোধ করতে হবে।
নতুন মূল্যহার অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৭ দশমিক ০৪ টাকা থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে সঞ্চালন ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৩১ পয়সা থেকে প্রায় ৩৯ পয়সায় উন্নীত করা হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ
নতুন দরে আবাসিক গ্রাহকদের প্রায় সব স্তরেই বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি মূল্য ৪ দশমিক ৬৩ টাকা থেকে ৫ দশমিক ৩২ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৬ দশমিক ১৮ টাকা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ৮ দশমিক ৫০ টাকা এবং ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ৯ দশমিক ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারে ইউনিটপ্রতি ৯ দশমিক ৬২ টাকা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটে ১৫ দশমিক ০১ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে প্রতি ইউনিট ১৭ দশমিক ৩৫ টাকা গুনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
শিল্প ও বাণিজ্য খাতেও প্রভাব
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। নিম্নচাপ, মধ্যমচাপ ও উচ্চচাপের শিল্প গ্রাহকদের জন্য পিক ও অফ-পিক উভয় সময়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে পিক আওয়ারে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১৫ দশমিক ২৭ টাকা এবং অফ-পিকে ১১ দশমিক ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও অফিস গ্রাহকদের জন্যও বিদ্যুতের দাম ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শিল্পখাতের পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।
সেচ, হাসপাতাল ও ব্যাটারি চার্জিংয়েও বাড়তি ব্যয়
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষি সেচ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি চার্জিংয়েও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
কৃষি সেচে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ৫ দশমিক ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ০৪ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য হারে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
কেন বাড়ানো হলো দাম?
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দাবি, উৎপাদন, আমদানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
ভোক্তাদের সমালোচনা
তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের নেতারা দাবি করেন, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে সরাসরি গ্রাহকদের ওপর বোঝা চাপানো হচ্ছে।
তাদের মতে, বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
মন্তব্য করুন