বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজস্বব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি ব্যবস্থায় বিস্তৃত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ অ্যাট আ ক্রসরোডস অব রিফর্মস’ শীর্ষক ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এডিবি বলেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণঝুঁকি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের শাসনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একই সময়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা জোরদারের পক্ষে মত দেয়।
এডিবি বলছে, এমন এক সময় এই রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটছে যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ ও বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও অর্থনীতির ভিত্তি এখনো সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮ শতাংশ, যা ২০২১-২৫ সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৫ শতাংশে।
সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কৃষি, শিল্প ও সেবা—সব খাতেই চাপ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে।
এডিবির পর্যবেক্ষণে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় কাঠামোগত সমস্যা হচ্ছে দুর্বল রাজস্বব্যবস্থা। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে মাত্র ৭.৫ শতাংশ, যা আঞ্চলিক ও সমমানের অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জটিল করহার, অতিরিক্ত কর-ছাড়, দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কাগজনির্ভর কার্যক্রম এবং কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অদক্ষতা তৈরি করেছে।
এডিবি আরও বলেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ঘাটতির কারণে কর ফাঁকি ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়ছে।
প্রতিবেদনে শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই অর্থের ওপর ২৫ শতাংশ কর আরোপ করা গেলে তা দেশের মোট কর আদায়ের প্রায় ১০ শতাংশের সমান হতে পারত।
এডিবি জানিয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের সরকারি ও সরকার-নিশ্চিত ঋণ জিডিপির ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। এর বড় অংশই অভ্যন্তরীণ ঋণ হওয়ায় ব্যাংকনির্ভর ঋণব্যবস্থা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ঋণস্থিতিশীলতা বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করতে পারে।
এডিবির মতে, দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখনো সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান দুর্বল এবং কেন্দ্রীয় কোনো সমন্বিত ঋণভান্ডার নেই।
সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও বড় দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেট ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে প্রায়ই বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। অর্থবছরের শেষ দিকে হঠাৎ উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে দুর্বল পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
পরিবহন খাতের ৩২৯টি প্রকল্প বিশ্লেষণ করে এডিবি জানিয়েছে, প্রায় অর্ধেক প্রকল্পেই নির্ধারিত সময় ও ব্যয়—উভয়ই বেড়েছে। গড়ে প্রকল্প ব্যয় ২৬ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন সময় প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকেও উদ্বেগজনক বলা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদে মুনাফার হার ৭৮ শতাংশ এবং ইকুইটিতে মুনাফার হার ৮৮ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তাদের দায় ও সরকারি গ্যারান্টিও বেড়েছে।
এডিবির মতে, মালিকানা নীতি, তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ দুর্বল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একই সঙ্গে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিএজি) নিয়মিত নিরীক্ষা করলেও দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাধার কারণে কার্যকর নজরদারি ব্যাহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে ব্যয় বাস্তবায়ন করতে হলে বড় ধরনের রাজস্ব সংস্কার প্রয়োজন হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
এডিবি যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশ করেছে, সেগুলো হলো—
মন্তব্য করুন