
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে ভারতের জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সরকারি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। গত আট দিনের মধ্যে এটি তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি।
শনিবার রাজধানী দিল্লি-তে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৮৭ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৯১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যেও আনুপাতিক হারে নতুন মূল্য কার্যকর করা হয়েছে।
সর্বশেষ এই বৃদ্ধির ফলে গত ১৫ মে থেকে দিল্লিতে পেট্রলের দাম মোট ৪ রুপি ৭৭ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৪ রুপি ৮১ পয়সা বেড়েছে। চার বছরের বেশি সময় পর গত ১৫ মে প্রথমবারের মতো জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলো।
নতুন দামে দিল্লিতে প্রতি লিটার পেট্রল বিক্রি হচ্ছে ৯৯ রুপি ৫১ পয়সায় এবং ডিজেল ৯২ রুপি ৪৯ পয়সায়। তবে রাজ্যভেদে করের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে দামের ভিন্নতা রয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার প্রতি লিটারে ৯০ পয়সা এবং ১৫ মে এক ধাপে ৩ রুপি দাম বাড়ানো হয়েছিল।
ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৫ মে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে সরকারি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনিক লোকসান কিছুটা কমেছে। তবুও পেট্রল, ডিজেল ও এলপিজি বিক্রিতে এখনও প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ কোটি রুপি ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে খুচরা পর্যায়ে দাম না বাড়িয়ে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ভারতের সরকারি তেল কোম্পানিগুলো। গত চার বছরে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি; বরং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এক দফা দাম কমানো হয়েছিল।
তবে পরিস্থিতির অবনতির কারণে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন চলাকালে সরকার রাজনৈতিক কারণে জ্বালানির দাম বাড়াতে চায়নি। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ভারতের জ্বালানি বাজারে খুচরা মূল্য সরাসরি সরকার নির্ধারণ না করলেও, বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি তেল বিপণন কোম্পানিগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করলে জনঅসন্তোষ ও মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হতে পারত। তাই ধাপে ধাপে মূল্য বাড়ানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তা মূল্যসূচকে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বাড়িয়ে দেয়।
DBS Bank-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ রাধিকা রাও বলেছেন, জ্বালানির দাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ বাড়লে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ থেকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালের রুশ ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতেও দুই ধাপে প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সম্প্রতি জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম সমন্বয় না করা হলে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত লোকসান ১ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
লোকসান কমাতে এর আগে সরকার পেট্রল ও ডিজেলে লিটারপ্রতি ১০ রুপি আবগারি শুল্ক কমিয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এই কর কমানোর ফলে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ১৪ হাজার কোটি রুপি রাজস্ব হারাচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে গিয়ে ভারতকে এখন অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়ছে।
গত বছর ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের গড় মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার। চলতি বছরের এপ্রিলে তা বেড়ে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে এখন পর্যন্ত গড় মূল্য প্রায় ১০৮ ডলারে অবস্থান করছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের তেল আমদানির ব্যয় ছিল প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ী থাকে, তাহলে চলতি অর্থবছরে ভারতের তেল আমদানি ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন