
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের –এর নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা কার্যত নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে অনেকেই এলাকাটিকে “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র” হিসেবে উল্লেখ করছেন।
বর্তমানে আবাসিক এলাকাটির নিরাপত্তা, রাস্তাঘাট, বিভিন্ন সেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা মূলত Bashundhara Group–এর নিয়ন্ত্রণাধীন। এলাকাটিতে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগতভাবে জমি কিনলে কাঠাপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বসুন্ধরার আবাসন কোম্পানিকে।
এ ছাড়া ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস চার্জ আদায় করে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। বাসিন্দাদের একটি অংশের অভিযোগ, এই সংগঠনও মূলত বসুন্ধরার প্রভাবেই পরিচালিত হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালেই এলাকাটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে সেখানে সিটি করপোরেশনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও এ বিষয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত ৭ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে কার্যকরভাবে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman এ-সংক্রান্ত নথিতে অনুমোদন দেন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গেজেটভুক্ত সব এলাকায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ আইন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বসুন্ধরা গ্রুপ বা তাদের নিয়ন্ত্রিত কোনো সংগঠন বাসিন্দাদের কাছ থেকে আলাদা ফি বা সার্ভিস চার্জ নিতে পারবে না। গৃহকর আদায় করবে সিটি করপোরেশন এবং নাগরিক সেবাও পরিচালিত হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়।
এলাকাটিতে পৃথক থানা স্থাপন, খেলার মাঠ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ বলছে, তারা সরকারের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রাস্তাঘাট, সেতু, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কিছু অর্থ নেওয়া হয়।
বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর ভবিষ্যতে প্রকল্পটি সরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর চেয়ারম্যান এ ধরনের কোনো চুক্তির বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে উন্নয়নকাজ শেষ হলে নাগরিক সুবিধাগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বসুন্ধরার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ঝুলে রয়েছে।
এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কোনো আবাসিক এলাকা আলাদা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন পরিচালিত হওয়া আইনের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র থাকতে পারে না। আবাসন প্রকল্প শেষ হলে তা সরকারি কর্তৃপক্ষের অধীনে দিতে হয়।”
বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ একরজুড়ে বিস্তৃত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন