
দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশু মৃত্যুর জন্য মায়েদের ‘ফিটনেস সচেতনতা’কে দায়ী করার যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। বরং চিকিৎসক, গবেষক ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে—টিকাদানে ঘাটতি, অপুষ্টি, দারিদ্র্য, মাতৃস্বাস্থ্যের দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই মূল সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল–এ হামে আক্রান্ত শিশুদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অধিকাংশ মায়েরই নিজের স্বাস্থ্য বা ফিটনেস নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। অনেক পরিবারেই মায়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বা পরিবারের সিদ্ধান্তেই শিশুদের টিকা দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চ–এর সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের দাবি করেছিলেন, ‘ফিটনেস হারানোর ভয়’ থেকে ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না। পরে তিনি বক্তব্য আংশিক সংশোধন করে জানান, তিনি আসলে একটি সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। তবে ওই প্রতিবেদনে মায়েদের ফিটনেস সচেতনতার কথা বলা হয়নি।
চিকিৎসকরা বলছেন, বুকের দুধ শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ার পেছনে বহু সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ রয়েছে।
২০২২ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, ০-৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হারও কমেছে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও মায়েদের ফিটনেস সচেতনতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শিশুকে পানি, ফর্মুলা দুধ বা অন্য খাবার দেওয়া, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মের হার বৃদ্ধি, কর্মজীবী মায়েদের পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা না পাওয়া, পরিবার থেকে সহায়তার অভাব এবং গুঁড়া দুধের আগ্রাসী বিপণন—এসব কারণ বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন–এর পরিচালক খুরশীদ জাহান বলেন, নতুন মায়েদের অনেকেই সন্তানকে কীভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে, তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সংকটে থাকেন। জন্মের পর প্রথম কয়েক দিনে দুধ কম আসলে তাঁরা মনে করেন, হয়তো শিশুকে খাওয়াতে পারবেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ–এর যৌথ গবেষণাতেও দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের হার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা এবার হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গত দুই বছরে টিকাদানে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধের ঘাটতিই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
এদিকে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের স্বল্পতা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপও অভিভাবকদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে গিয়ে শিশু হারানোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী অন্তত চারবার প্রসবপূর্ব সেবা পেয়েছেন মাত্র ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মা। এসব তথ্য মাতৃস্বাস্থ্যের দুর্বল অবস্থাই তুলে ধরে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ–এর সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, হামে শিশুমৃত্যুর দায় শুধু মায়েদের ওপর চাপানো বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করার কৌশল। তাঁর মতে, দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে শুধু মায়েদের দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়।
মন্তব্য করুন