দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। টানা আট মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে আটকে রয়েছে। সর্বশেষ গত মার্চ শেষে এ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে গত এক দশকের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ফলে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে তা মার্চে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, ব্লকেড ও কারফিউয়ের সময় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। ওই সময় নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পুরো অর্থবছরজুড়েই ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিনিয়োগে বড় ধরনের গতি ফেরেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। তবে সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। কয়েক বছর আগেও জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৪ শতাংশের ওপরে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অর্থ হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাওয়া। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের পর প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, প্রশাসনিক হয়রানি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। এ খাতে গতি না ফিরলে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি—সবকিছুই দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হবে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এটি করোনা মহামারির প্রথম বছরের পর সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
গত অর্থবছরের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পরে অন্তর্বর্তী সরকার তা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন বা সভা-সেমিনার আয়োজন করে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বল্প সুদে ঋণপ্রবাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্তব্য করুন