হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও উজানের ঢলে এবার বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষক, কৃষি বিভাগ ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশের মোট চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। সরকারি হিসাবে, দেশের মোট চালের চাহিদার প্রায় ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ পূরণ হয় বোরো থেকে। বাকি অংশ আসে আমন ও আউশ থেকে। চলতি বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল দুই কোটি ২৭ লাখ টন।
তবে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দাবি, এবারের বন্যায় অনেক এলাকায় অর্ধেকেরও কম ফলন হয়েছে। কোথাও কোথাও গত বছরের তুলনায় উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, ঘরে তোলা ধানের মানও ভালো হয়নি। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন তারা।
যদিও কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ক্ষতির পরিমাণ এতটা ভয়াবহ নয়। তাদের মতে, মোট উৎপাদনের ১০ থেকে ১২ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় আগাম ধান কাটা সম্ভব হয়নি সেখানে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, দেশে তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকট তৈরি হবে না। সরকারি মজুত, আমদানি সক্ষমতা ও বিকল্প সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘাটতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রয়েছে। বর্তমানে সরকারের খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১৯ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টন ধান, মিল মালিকদের কাছ থেকে ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ টন আতপ চাল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহের অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বোরো উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে আবারও চাল আমদানির দিকে যেতে হতে পারে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে ভারত, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করা হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের বার্ষিক খাদ্য চাহিদার বড় অংশই বোরো চাল দিয়ে পূরণ হয়। ফলে উৎপাদন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে চালের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল থাকলে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নআয়ের মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, বন্যা-সহনশীল ধানের জাত, কৃষি বিমা, দ্রুত ফসল কাটার ব্যবস্থা ও আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য মিলছে না। সার, সেচ, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক এবার লাভ তো দূরের কথা, মূলধন তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কৃষক জুলহাস উদ্দিন জানান, গত বছর যেখানে তার লাভ হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা, সেখানে এবার প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একইভাবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর কৃষক হাজী আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া বলেন, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে এবার তার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষকদের পুনর্বাসনে কাজ চলছে। পাশাপাশি সার্বিক উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয়।
মন্তব্য করুন