নীতিসুদহার বাড়ানোর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সুদ কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। এ পরিস্থিতিতে আগামী মুদ্রানীতিতে সুদহার কমানো হবে কি না, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
বুধবার গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকরা অংশ নেন। সেখানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে কয়েকজন কর্মকর্তা সুদহার কমানোর পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি, বর্তমানে উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা বলেন, আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
তবে অপর একটি পক্ষ এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। কয়েকজন কর্মকর্তা ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলা ‘নয়-ছয়’ সুদহার ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ওই সময় সুদহার কম থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে শুধু সুদহার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জাকির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষ সাধারণত ঋণনির্ভর নয়। পণ্যের দাম বাড়লেই মানুষ ঋণ নেয় না। তাই সুদহার বাড়ানো বা কমানোর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক সবসময় সরাসরি কাজ করে না। তার মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কৃষি উৎপাদনের পরিস্থিতিও মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক সূত্র বর্তমান বাস্তবতায় সবসময় কার্যকর হচ্ছে না। তাই সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে।
বৈঠকে ভালো ব্যাংকগুলোর বাড়তি মুনাফার বিষয়টিও উঠে আসে। কর্মকর্তারা জানান, দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে গ্রাহকরা তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকে অর্থ রাখছেন। ফলে এসব ব্যাংক কম সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও ঋণ বিতরণে উচ্চ সুদ নিচ্ছে। এতে তাদের সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড বেড়ে গেছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবেই এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে মার্চ পর্যন্ত তা অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ।
মন্তব্য করুন